Home ধর্ম ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানের বিভাজন এবং বাংলাদেশে মৌলবাদী তৎপরতা

ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানের বিভাজন এবং বাংলাদেশে মৌলবাদী তৎপরতা

245
0
ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানের বিভাজন এবং বাংলাদেশে মৌলবাদী তৎপরতা
ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানের বিভাজন এবং বাংলাদেশে মৌলবাদী তৎপরতা

পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই এদেশের অনেক রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক এবং সমাজসেবী বুঝতে পেরেছিলেন যে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা-ভিত্তিক সৃষ্ট একটা রাষ্ট্র যা ভৌগোলিক অবস্থানে নাজুক তাকে টিকিয়ে রাখা খুব সহজ হবে না। এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগের নেতারা যারা পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারাও জানতেন যে পাকিস্তান একটা টেকসই রাষ্ট্র হওয়ার নয়। আর প্রগতিশীল বামপন্থীরাও সাম্প্রদায়িকতাভিত্তিক একটা রাষ্ট্র সৃষ্টি শুভ দৃষ্টিতে দেখেননি।

তাই যে নীতিভিত্তিক পাকিস্তান সৃষ্টি হলো তার বিকল্প চিন্তাধারা তাদের পাকিস্তান সৃষ্টির আগ থেকেই ছিল। এমনকি মুসলিম লীগের খাতায় নাম থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সাংস্কৃৃতিক গোষ্ঠীর সদস্যরা বিকল্প অনুসন্ধানে তৎপর ছিলেন। তমুদ্দিন মজলিস ছিল ওইরকম একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন।
বৃটিশদের কবল থেকে ভারত স্বাধীন হোক এটা মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস নেতারা উভয়ই চেয়েছিলেন। তবে বিভক্তি যেভাবে হয়েছে তা অনেকেই প্রত্যাশা করেননি। কেন লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা গেল না তা অনেকেরই জানা আছে।

অসাম্প্রদায়িক অনেক বাঙালি নেতা এর সমর্থক ছিলেন। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের দ্বন্দ্ব যা পরে চরম রাজনৈতিক সংঘাতে রূপান্তরিত হয় তা ভারতের বিভক্তি সুনিশ্চিত করে এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করল যে শুধু নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত বিভক্তি অত্যাসন্ন হয়ে পড়ল। ফলে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতারা বৃটিশদের পরামর্শে র‌্যাটক্লিক রোয়ারদা মেনে নিলেন। হিন্দু ও মুসলিম মেজরিটি এলাকা নিয়ে যেভাবে ভারত বিভক্ত ও স্বাধীন হলো তা কিন্তু বিভক্তির মূল সূত্রেরই বিরোধী হয়ে দাঁড়াল। হিন্দুদের জন্য ভারত আর মুসলমানের জন্য পাকিস্তান এ নীতি কার্যকর করা গেল না।

তাই বিভক্তির পরও ভারতে কয়েক কোটি মুসলমান ও পাকিস্তানে কয়েক কোটি হিন্দু রয়ে গেল এবং তারা কয়েক দশক ধরে ভ্রান্ত রাজনীতির খেসারত দিলেন এমনকি এখনো দিচ্ছেন।
ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র সৃষ্টির ভ্রান্ত নীতি যে কত ভয়াবহ তা এ উপমহাদেশের জনগণ প্রায় ৭ দশক ধরে প্রত্যক্ষ করে আসছে। রাষ্ট্র সৃষ্টির মূলে যদি সাম্প্রদায়িকতা কাজ করে তবে সে রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ করা খুব কঠিন এবং নিরপেক্ষ না হলে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং সে কারণে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। ভারত বিভক্তির পর যে কত হিন্দু-মুসলমানকে উভয় রাষ্ট্রে জীবন দিতে হয়েছে, কত বিষয় সম্পত্তি ও সম্পদ লুণ্ঠিত হয়েছে তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। বোধহয় বৃটিশ উপনিবেশ শক্তি এটাই চেয়েছিল।

কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতারা তাতে ইন্ধন জোগান। ধর্ম রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভিত নির্মাণে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, আচার, ঐতিহ্য, ভাষা ও ভৌগোলিক অবস্থানের ব্যাপারে কোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বা সম্ভব ছিল না। ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। সে কারণেই সাম্প্রদায়িকতাকে ঝেড়ে ফেলে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না।


ভারতের কথা একটু স্বতন্ত্র। সেখানে অগণিত জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং সংস্কৃতির লোকের বসবাস। গোটা ভারতব্যাপী একটা নির্দিষ্ট ধর্ম বা সংস্কৃতির অনুসারীরা দেশব্যাপী প্রভাব বিস্তার করে রাষ্ট্র ও রাজনীতির পরিবর্তন করতে সক্ষম নন। যা নাকি পূর্ববাংলার জনগণের জন্য সহজ ছিল এবং ছিল বলেই বারবার পরিবর্তন এসেছে কখনও উন্নতি কখনও অধোগতির দিকে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সামরিক শাসন হয়েছে বারবার কিন্তু ভারতে একবারো হয়নি বা হওয়ার সম্ভাবনাই নেই। ইসলামের কথা বলেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উভয় অংশের অধিবাসীদের সমন্বিত করা বেশ কিছুটা সম্ভব হলেও অর্থনৈতিক কারণে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি।

ঠিক এ রকম একটা বাস্তবতায় বাংলাদেশের জনগণ ভাষা, আচার, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি ভিত্তিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রীয় পটভূমির পরিবর্তন খুব সহজসাধ্য ছিল বলে মনে হয় না। শেখ মুজিব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গেই সে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সে কারণেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ভেতর পার্থক্য এটাই। অত্যন্ত সঙ্গতকারণে পাকিস্তান বলতে বোঝায় ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার, পেছনের দিকে অধোযাত্রা আর স্বাধীন বাংলাদেশ হচ্ছে ঠিক তার বিপরীত। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতি, বিজ্ঞানমনস্কতা, সংস্কার ও সম্মুখের দিকে অগ্রযাত্রা।

বাংলাদেশ সৃষ্টির পরও যারা এদেশ ও সমাজকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান তারা কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়মের বিপরীতেই কাজ করছেন। দিন যত যাচ্ছে প্রতিক্রিয়ার মাত্রা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এ প্রতিক্রিয়ার ধারায় সহযোগিতার কাজ করছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগ। বাংলাদেশ থেকে হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালে বিতাড়িত হলেও পাকিস্তানের রাজনীতি ও সংস্কৃতির ধারক চরদের অনুপ্রবেশ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। পাকিস্তান একদিনের জন্য আইএসআইকে বাংলাদেশে তৎপরতা থেকে বিরত রাখেনি এবং এ তৎপরতার কারণেই বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হতে পারছে না।


বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশে হয়তো সাম্প্রদায়িকতা তেমন বিস্তার লাভ করবে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এখানে প্রগতির ধারা যতটা না বিকাশশীল তার চেয়ে বেশি অগ্রসরমান হয়েছে প্রতিক্রিয়ার ধারা, মৌলবাদ, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ। পাকিস্তান আমলে মাদ্রাসা ও মসজিদভিত্তিক শিক্ষার বিস্তার লাভ করেছিল আর এখন সুদূর পাড়াগাঁয়ের মাদ্রাসায় পর্যন্ত অস্ত্রের প্রশিক্ষণ চলছে। পাকিস্তান আমলেও আদালতে ঢুকে বিচারক হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটেনি। পাকিস্তান আমলে পূর্ববাংলায় একজন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল কি না সন্দেহ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যা ঘটেছে তা স্বতন্ত্র।

শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যা যা নাকি ১৪ ডিসেম্বর সংঘটিত হয়েছে তা ছিল যুদ্ধেরই অংশবিশেষ। মৌল ও জঙ্গিবাদের এ বিস্তারে পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগ বিশেষভাবে তৎপর, সে তৎপরতা এখনো অব্যাহত আছে। এ ব্যাপারে কোটি কোটি ডলার খরচ করা হচ্ছে। ওই দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রভাবিত করে নিজেদের মতো করে কাজ করে চলেছে। এদেশের মৌলবাদী শক্তি প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাদের সহযোগিতা করছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতরা প্রথমে গোপন কাজ করলেও এখন প্রায় প্রকাশ্যেই তাদের ক্রিয়াকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করাই তাদের মূল লক্ষ্য। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যে স্বাভাবিক হতে পারছে না তার একটা কারণ পাকিস্তানের গোয়েন্দা তৎপরতা। এদেশের মৌলবাদী সন্ত্রাসী শক্তিকে তারা অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে ইন্ধন জোগাচ্ছে। আর এখানে ঠিক পাকিস্তানি কায়দায় ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি করেও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। আইএসআই ও তাদের সহযোগী কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তির বীজ বপন করে চলেছে।
দেশের অভ্যন্তরে যে জঙ্গিবাদী ও মৌলবাদী তৎপরতা চলছে তার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট রয়েছে আইএসআই। এদের নেটওয়ার্ক এখন বাংলাদেশে অনেক বিস্তৃত।

রাজনৈতিক দল, ছাত্র, শ্রমিক সংগঠন, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারী, নিরাপত্তারক্ষী, পুলিশ, বিভিন্ন স্তরের জনগণের ভেতর আজ পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগের লোক কাজ করছে। আর পাকিস্তানের দূতাবাস তাদের সক্রিয়ভাবে সাহায্য করছে। অনেক মসজিদ, মাদ্রাসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, আইনজীবী, চাকরিজীবী এখন আইএসআই দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সরকারি দৃষ্টির বাইরে এরা কাজ করছে। পাকিস্তানের অসংখ্য নাগরিক আজ বাংলাদেশে বিভিন্ন সাংগঠনিক তৎপরতায় লিপ্ত। তারা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করছে আর আমাদের যুবশক্তি তাদের কবলে পড়ছে।
সীমান্তে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বিরোধ তার পেছনে রয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা। সে কারণেই সীমান্তে গোলাগুলি ও নিরীহ মানুষের হত্যাকা- বন্ধ হচ্ছে না

। সীমান্তে অস্থিরতা সৃষ্টি করে পাকিস্তান তাদের ভারতবিরোধী তৎপরতা চালিয়ে বাংলাদেশের ওপর তার দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে চায়। পাকিস্তান আমলেও এটা ছিল। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের তৎপরতার কারণে এবং শেখ হাসিনার সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে তার ধারাবাহিকতায় ওই ধরনের তৎপরতা বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে।
সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদকে সক্রিয় রাখতে না পারলে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাবে এটা পাকিস্তান বুঝতে পেরেই বাংলাদেশকে ক্রমাগত পিছু টানছে। অবশ্য এখানে তাদের সহযোগিতা করার লোকজনের অভাব নেই। তাদের পূর্বসূরিরা যেভাবে কাজ করছে তারা তার চেয়েও বেশি গতিতে কাজ করছে। এখন বাংলাদেশের অনেক কিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে বাংলাদেশকে জড়িত করার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।


ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসনের বাংলাদেশে যা করা হচ্ছে তার একমাত্র লক্ষ্য প্রতিক্রিয়ার ধারাকে শক্তিশালী করা। তারা সফলতার সঙ্গে তা করে চলেছে। এদেশে এমন অনেক তথাকথিত গণআন্দোলন ও গণবিক্ষোভ সংঘটিত হচ্ছে যার নিয়ন্ত্রক আইএসআই অথবা তাদের নিয়োজিত সংস্থা। সমাজের এমন কোনো স্তর নেই যেখানে তারা অনুপ্রবেশ করেনি। মসজিদ-মাদ্রাসা তৈরি করে দেয়ার নামে তারা এদেশে প্রতিক্রিয়ার ঘাঁটি তৈরি করে দিয়েছে।
বাংলাদেশ রাজনৈতিক অর্থে স্বাধীন করা হলেও পাকিস্তানের প্রভাবমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রেখে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে কোনো সরকারের পক্ষে স্থিতিশীলতা লাভ করা সম্ভব নয়।

বারবার পাকিস্তানি ধারায়ই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবর্তিত হচ্ছে। কেউ কি কোনোদিন ভেবেছে যে স্বাধীন বাংলাদেশে বারবার সামরিক শাসন জারি করা হবে। কেউ কি ভেবেছিল মাত্র ৩০ মিনিটে ৪৫০ জায়গায় বোমা হামলা চালান সম্ভব হবে। প্রকাশ্য দিনের বেলায় বোমা হামলা চালিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করার চেষ্টা করা হবে এসব তো কেউ কল্পনাও করেনি কোনোদিন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় ৪ দশক অথচ স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি এখানে ক্ষমতাসীন রয়েছে খুব বেশি হলে মাত্র ১০ বছর, বাকি ৩ দশকই পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা বাংলাদেশ শাসন করেছে। ফলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। বারবার স্বৈরাচার ক্ষমতাসীন হয়েছে, গরিব এবং ধনীর ব্যবধান বেড়েই চলেছে।

আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েও তা ধরে রাখতে পারিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও পাকিস্তান বাংলাদেশকে তার প্রভাববলয়ে অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছে। পাকিস্তানের সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি সাধনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেও বাংলাদেশ যাতে ভারত বিরোধিতায় ঠিক পাকিস্তান আমলের মতো সক্রিয় থাকে, আইএসআই সে ধরনের তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী জামায়াত চক্রকে তারা ব্যবহার করছে। অবশ্য পাকিস্তান এখন আলকায়েদা-তালেবান চক্রের খপ্পরে পড়ায় অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন হয়তো আগের মতো তৎপরতা বাংলাদেশে পরিচালনা সম্ভব হবে না।

সে দেশের সরকারবিরোধী তালেবানচক্র বাংলাদেশের জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র জোগান দেয়া শুরু করেছে। বাংলাদেশ এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারে। তাছাড়া পাকিস্তানে জামায়াতপন্থীরা সরকারের বিরোধী হওয়ায় বাংলাদেশ অন্তত জঙ্গি নিয়ন্ত্রণে সার্কভিত্তিক প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাকিস্তান থেকে পেতে পারে। এখানে ভারতের কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণ আছে বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ভারতের সহযোগিতা যেমন প্রয়োজন ঠিক একইভাবে সার্কভিত্তিক জঙ্গিবাদবিরোধী তৎপরতায় পাকিস্তানের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া অসম্ভব নয়। প্রয়োজন দক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতা। দক্ষিণ এশিয়াকে জঙ্গিবাদী তৎপরতার অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এটা বাংলাদেশের সব সময় স্মরণ রাখা উচিত।


স্বাধীন বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ প্রক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার কথা ছিল তা হতে পারেনি। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও প্রগতির শত্রুরা মোটামুটিভাবে এক হয়ে তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখলেও স্বাধীনতার সপক্ষের সব শক্তি তাদের বিপরীতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি এবং বারবার প্রতিক্রিয়াশীলরা ক্ষমতাসীন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশকে তার ঈপ্সিত লক্ষ্য হতে ভ্রষ্ট করেছে। স্বাধীনতা অর্জনের ৪ দশক পর তাই এখনো আহ্বান জানাতে হচ্ছে ঐক্য প্রতিষ্ঠার। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বারবার আঘাত হানলেও স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সপক্ষের অসাম্প্রদায়িক শক্তি জোট বেধে তাদের মোকাবেলা করতে পারেনি। এমনকি মহাজোট করে বিপুল ভোটে ক্ষমতাসীন হয়েও অবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রয়োজনে জোট গঠন আর দেশ ও জাতির জন্য অর্থপূর্ণ যৌক্তিক রাজনৈতিক সমঝোতা এক নয়।


ক্ষমতার জোট ক্ষণস্থায়ী হতে বাধ্য। আর আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক মেরুকরণ ক্রমাগত স্থিতিশীলতার দিকে দেশ ও জাতিকে পরিচালিত করে জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে অসামান্য অবদান রাখতে পারে।
আমাদের প্রতিপক্ষ প্রচ- আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হয় অথচ আমরা জোট গঠন করে ক্ষমতাসীন হয়েও তাদের প্রত্যুত্তরে যা করা দরকার তা করতে পারছি না। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির সার্বিক ঐক্য ও সমঝোতাই পারে বর্তমান বিদ্যমান রাজনৈতিক সঙ্কটের মোকাবেলা করতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here